বড় হবার পর বুঝলাম যে আর্টসেল কি!



সময়টা তখন ২০০৭। তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। তখন আমাদের একটাই কাজ ছিল। ক্লাস করে বাসায় গিয়েই আবার স্কুল মাঠে খেলতে আসা। ইচ্ছে মত ক্রিকেট খেলসি তখন। আর যেদিন বৃষ্টি হ‌ইতো সেদিন আমাদের মন খারাপ হ‌ইতো না। ঐদিন আমাদের কাজ থাকতো স্কুলের ছাদে উঠে গাজী ট‍্যাংক টাকে ঢোল বানিয়ে গান গাওয়া। আমি, মেহের, রহমত‌উল্লাহ, শাকিল, আল আমিন, জহির একসাথে মনের আনন্দে গান গাইতাম। তাহসান এর গান তখন বেশি গাইতাম। খালিদের হিমালয়, ফুয়াদের বন‍্য, নিটোল পায়ে তখন মুখে মুখে থাকত। 

স্টোইক ব্লিসের আবার জিগায়, পাখি পাকা পেপে খায়, এসিড কে, আবার আবার জিগায়, এই যে আমি, বেড়াজাল এইসব গান গুলা মাথা নষ্ট করে দিসিলো। শিরোনামহীন তখন একটা হ‌ইচ‌ই ফেলে দিসিলো পুরা বাংলাদেশে। জাহাজী, বন্ধ জানালা গানগুলা তখন তরুন, কিশোরদের যেন জাতীয় সঙ্গীত হয়ে গেসিল। 

আব্বা ধার্মিক হ‌ওয়াতে আমি বেশি গান শুনতে পারতাম না। লুকিয়ে লুকিয়ে গান শুনতে হ‌ইতো। তাই অনেক গান‌ই আমি অনেক পরে শুনসি। অর্নবের সে যে বসে আছে প্রথমবার শুনে আমার শরীরের পশম সব দাঁড়ায় গেসিলো। গান শুনে যে শরীরের পশম দাড়াইতে পারে সেটা আমি ঐদিন বুঝছিলাম। তারপর বের হ‌ইলো অর্নবের তোমার জন্য। এই গানটা আমি প্রথম রেডিওতে শুনি। আমি চ‍্যানেল চেন্জ করতে করতে রেডিও ফুর্তিতে গানের গিটারের পার্ট টা শুনি প্রথমে। গানের নামটা শুনতে পারি নাই তখন। কিন্তু গিটারের টোন টা শুনে আমি রিতিমত কাপাকাপি লাগায় দিসিলাম। এত সুন্দর করে কে বাজাচ্ছে!!! তারপর গান শুরু হবার পর বুঝলাম এইটা অর্নবের গান। ইর্ষা হচ্ছিল যে মানুষটা এত সুন্দর গায় কিভাবে আর গিটারের কাজ গুলা ওর মাথায় আসে কিভাবে!!! 

ওয়ারফেইজের শোনা প্রথম গানটা ছিল বসে আছি একা। তখন গিটারের ডিস্টোরশন টোনের কাহিনী বুঝতাম না। কে যেন বলসিল এটাকে বেজ গিটার বলে!! ওটা শুনে আমিও ভাবতাম এটা বেজ গিটার। তারপর শোনা হ‌ইসিলো যত দুরে গানটা। এক কথায় অসাধারণ। তবে ওয়ারফেইজের বেস্ট গান আমার কাছে মহারাজ আর ধূপছায়া গানটা। বেশি জোস!!!


 নাইন টেনের বয়সে আমি আর্টসেল অত বুঝতাম না। তখন ওদের গান মানেই বুঝতাম দুঃখ বিলাস আর পথ চলা। বড় হবার পর বুঝলাম যে আর্টসেল কি!!! প্রত‍্যেকটা গান এত অসাধারণ কিভাবে বানাইসিলো তারা !! গন্তব্যহীন, রাহুর গ্রাস, ছায়ার নিনাদ, ঘুনে খাওয়া রোদ, অন‍্যসময়, এই বিদায়ে, অনিকেত প্রান্তর, অবশ অনুভূতির দেয়াল, পাথর বাগান, অদেখা স্বর্গ, ভুল জন্ম, পথ চলা, ধূসর সময়, অলস সময়, অপ্সরী, বাংলাদেশ স্মৃতি ও আমরা, শহীদ স্বরনী আহ!! মাস্টারপিস একেকটা। চিলে কোঠার সেপাই গানটার কথা আলাদা ভাবে বলতে হয়। এই গানটা আমার রক্তের সাথে মিশে থাকে সবসময়। এই গানের একটা লাইন আছে, লাইনটা হচ্ছে “তোমার নীল আকাশ শূন্য চোখে চেয়ে থাকে” । কেন জানি এই লাইন আমার বেশি প্রিয়। প্রতিদিন‌ই আমি বিড় বিড় করে এইটা গাই। আমার প্রত‍্যেকটা ব‌ই আর খাতায় এই লাইনটা লিখা আছে। 

ব্ল‍্যাকের সাথে প্রথম পরিচয় ২০০৮ এ। ওদের প্রথম শোনা গানটা ছিল শ্লোক। শোনার পর আমার প্রথমেই মনে হ‌ইসে এটা একটা অদ্ভুত গান। অদ্ভুত সুন্দর গান এইটা। এবং এই ধরনের গান আমি আগে কখনো শুনি নাই। লিরিক্সের আগামাথা কিছুই বুঝি নাই। এখনো ব্ল‍্যাকের অনেক গানের অর্থ আমি বুঝি না। ওদের অভিমান গানে “দু চোখ অন্ধের উপড়ে ফেল তুমি/ মাতাল ভাড় হোক সঙ্গী তার” এই লাইনের অর্থ বের করতে গিয়ে আমি আর রাত্রি যে কত ঝগড়া করসি তার হিসাব নাই। এখনো আমি জানি না এই লাইন দুইটার মানে কী!!! আমার পৃথিবী, পরাহত, অপমিত, মিথ্যা, ব্লুজ এন্ড রোদ। এই গান গুলা আমাদেরকে নতুন একটা গানের জগতের সন্ধান দিসিলো। অর্থহীনের চাইতে পারো গানটা বাংলাদেশের তরুনদের জাতীয় সঙ্গীত ছিল। এই গানের গিটারের ইন্ট্রো শুনলে ঝিমাইয়া থাকা ছেলেটাও লাফিয়ে উঠে। তুমি ভরেছো এ মন, অসমাপ্ত ১, যদি কোন দিন, আনমনে, নিকৃষ্ট, গুটি, এপিটাফ, অদ্ভুত সেই ছেলেটি এই গান গুলা আজীবন থেকে যাবে। 


আমি নাইনে যখন পড়ি, তখন ভাবতাম যে গিটার মনে হয় ধরে তারের মধ্যে বারি দিলেই বাজবে। তখন তো বুঝতাম না কিছু। নাইনের লাস্টের দিকে প্রচন্ড ইচ্ছে হ‌ইসিলো গিটার কিনবো। আম্মুকে বললাম যে আমি গিটার কিনতে চাই। আম্মু বলল আব্বা গিটার দেখলে ভাইঙ্গা ফালায় দিবে। স্বাভাবিক ভাবেই মানা করে দিল আম্মা। আমি বাসায় আলমারির পাশে কোনা আবিষ্কার করে বললাম যে এইখানে লুকায়ে রাখবো আব্বা বুঝবে না। তারপর আম্মাকে বহু রিকোয়েস্ট করার পর রাজী হ‌ইসিলো যে ঠিক আছে আব্বাকে জানানো হবে না কিন্তু সে গিটার কেনার টাকা দিতে পারবে না। তারপর আমার শুরু হ‌ইলো টাকা জমানো। সাময়িক ভাবে সিগারেট ছাইড়া দিলাম টাকা জমানোর জন‍্য। কিন্তু ওই বয়সে কত‌ই আর জমানো যায়!! ঈদের সেলামী কিছু মিলায়া ৬০০ টাকা জমাইলাম। কিন্তু এই টাকায় কি আর নতুন গিটার কেনা যায়! তখন ফেরেশতার মত হাজির হ‌ইলো শাকিল। ও বললো যে ওর গিটারটা ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে রাজী আছে। কিনে ফেললাম। শাকিল ঐদিন গিটারটা বিক্রি করায় ওর কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। ঐরকম খুশী মনে হয় আর কখনো হ‌ই নাই। তারপর শুরু হ‌ইলো আসল ঝামেলা। আমি যেটা ভাবসিলাম তার পুরাটাই উল্টা। বারি দিলে ঠিক‌ই বাজে কিন্তু ঐটা কোন অর্থবোধক জিনিস না। কিছুই বুঝি না। কাউকে চিনতাম‌ও না যে জিগ্গেস করবো। কোর্ড তো দুরের ব‍্যাপার গিটারের যে টিউন করতে হয় এইটাই জানতাম না। টিউনার কী গুলা দেখে ভাবসিলাম এইগুলা দিয়ে গিটারের তার টাইট করে। তারপরও গিটারটা নিয়া উরাধুরা বারি দিতাম আর তার সাথে গান গাওয়ার চেষ্টা করতাম। ঐটাতেই মনে হ‌ইতো কি যেন করে ফালাইতেসি। একদিন গিটার নিয়ে শাকিলের বাসার নিচে দাড়ায় ছিলাম। তখন একটা ভাইয়া ঐই রোড দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ থেমে বললো গিটারটা একটু দেখতে চায়। অবাক হয়ে দিলাম তাকে। সে দেখি প্রথমে গিটারের টিউনার কী ধরে ঘুরাচ্ছে। আমি তাকে জিগ্গেস করলাম ভাই এইগুলা দিয়ে কী তার টাইট করে না?? সে হেসে বললো না ভাইয়া এইগুলা দিয়ে গিটার টিউন করে। সব আমার মাথার উপর দিয়ে গেসিল ঐদিন। তারপর সে কী গুলা ঘুরায় টুরায় গিটারের তারগুলার মধ‍্যে কোথায় কোথায় যেন ধরে “ঐ দুর পাহাড়ের ধারে” এই রকম একটা গান গেয়ে ফেলল। আমি তো মুগ্ধ। শাকিল‌ও মুগ্ধ। এই‌ সুযোগ ভাইবা আমি তাকে বলসিলাম ভাইয়া আমাকে শিখাবেন?? সে উত্তর দিসিলো যে সে ওত ভালো বাজাইতে পারে না গিটার তবে সে আমাকে টিউন কিভাবে করতে হয় সেটা এখন শিখাতে পারবে। আমি এতেই খুশি। সে টেকনিক টা দেখাইলো কোন তারের কোন ফ্রেট ধরে মিলিয়ে মিলিয়ে কিভাবে টিউন করতে হয়। কিছুই বুঝি নাই যদিও তারপরও ভাইয়া বিরক্ত হ‌ইতে পারে ভেবে বলসিলাম বুঝসি ভাই। ঐই ভাইয়া আমাদের এইখানে থাকতো না তাই ওনার সাথে আর কখনো দেখা হয় নাই। তারপর ঈদগাহ মাঠের কোনায় টং গুলার ঐখানে গিটার বাজাইতো এরকম একটা ভাইয়ের সাথে পরিচয় হ‌ইসিলো। সেও আমাকে টিউন করে দিত কিন্তু বুঝতে পারতাম না কিছুই। যখন‌ই টিউন নষ্ট হ‌ইতো ওনার কাছে নিয়ে যাইতাম। আর আমার বন্ধুরা হাসতো। একদিন ভাইয়া একটু রাগ দেখাইলো যে বারবার তার কাছে যাই টিউন ঠিক করার জন‍্য। তাই পরে ঐদিন আমি নিজে টিউন নষ্ট করে গিটার টিউন করা শিখসিলাম। ঐদিন ভাইয়া রাগ না করলে মনে হয় এত তাড়াতাড়ি টিউন করা শিখতাম না। ততদিনে কুমিল্লার ফয়সাল ভাইয়ের কল‍্যানে সি মেজর, জি মেজর, ডি মেজর, এ মাইনর, ডি মাইনর এইগুলা শিখসিলাম। 

কলেজে উঠে রাহাতের সাথে পরিচয় হবার পর ও আমাকে প্রথম মেটালিকার সাথে পরিচয় করায়। নাথিং এলস মেটার গানটা শুনে উইরা গেসিলাম পুরা। রাহাত আমাকে পেনড্রাইভে করে ওদের কিছু গানের লাইভ ভিডিও দিসিলো। এই খানে জেমস হেটফিল্ড নাথিং এলস মেটার গানটায় কিভাবে গিটারটা বাজাচ্ছে ঐইটা বোঝার জন‍্য কমপক্ষে ৮০ থেকে ৯০ বার ভিডিও চালিয়ে চালিয়ে দেখসি। লাভ হয় নাই কোন। তখন আমি নকিয়া সুপারনোভা কিনসিলাম। এমবি কিনে তখন গিটার লেসন সার্চ করতাম। এইভাবেই একদিন চিনলাম গিটার ট‍্যাব। লাইনের মধ্যে কোন তারের কোন ফ্রেট বাজাচ্ছে এইটা লিখা থাকে ট‍্যাবে। বার বার তো আর এমবি কেনার টাকা থাকে না তখন। তাই অপেরা মিনির পেইজ সেভ করে রাখার অপশনটার কারনে অপেরা মিনিকে ক‌ইলজার টুকরা মনে হ‌ইতো। আমার মাথায় এমন ক‍্যারা ছিল যে কলেজে যেহেতু মোবাইল নেয়া যাইতো না, আমি এই কারনে কাগজে ট‍্যাব লিখে নিয়ে যাইতাম কলেজে। রব স‍্যার ব‌ইয়ের দিকে তাকিয়ে একমনে ম‍্যানেজমেন্ট পড়াইতো আর এই সুযোগে আমি কাগজটা বের ক‌ইরা নাথিং এলস মেটারের গিটার ট‍্যাব মুখস্ত করতাম। সি ২ সেকশনের ছাত্র হিসেবে সেটা কঠিন অপরাধ ছিল। কিন্ত ঐই অপরাধ গুলাই স্বর্গ মনে হ‌ইতো তখন।


এখন‌ আর আগের মত কিছু নাই। সব হাতের নাগালে। তারপরও ঐই ভালো লাগা গুলা এখন আর কারো মনে দাগ কাটে না। আব্বার কঠোর ধার্মিক হ‌ওয়ার কারনে আমি কখন‌ই কারো কাছে গিটার শিখতে পারি নাই। শিখলে হয়তো আজকে চারটা কর্ড এর বাইরেও কিছু বাজাইতে পারতাম। রাতে লুকায়া লুকায়া চারটা কর্ড বাজানো শিখাতেই আমার স্বর্গীয় আনন্দ ছিল। একবার ধার দেনা করে এক কোরীয়ান স্কুলে গিটারের লেভেল ১ শিখতে গেসিলাম। তখন আমি নাইনথ সেমিস্টারে। ক্লাসে সবাই ই ছোট ছিল আমার। বেশিরভাগ ছেলে মেয়েই নাইন টেনে পড়ে এরকম ছিল। প্রথম ক্লাসে দেখসিলাম একটা ছেলেকে জোর করে তার বাবা গিটার শেখানোর জন‍্য ভর্তি করসে কিন্তু ছেলেটা চাচ্ছে না। ঐদিন খুব কষ্ট পাইসিলাম যে ইশ আব্বাও যদি এরকম আমাকে নিয়া আসতো। আদর ক‌ইরা যদি বলতো যা বাবা গিটার শেখ, পড়াশোনা তো অনেক করলি!! ১০ বছর ধরে আব্বার চোখ থেকে আমি যে কেমনে গিটার লুকায়া রাখসি সেইটা ভাবলে আমার অবিশ্বাস্য মনে হয়!! 


গিটার বাজানো শিখতে পারি নাই কিন্তু আগের রাতে আব্বা যখন নামাযে যাইতো তখন গিটারটা বাসা থেকে শিপুর বাসায় লুকায়ে রেখে পরদিন স্কুলে এস এস সির কোচিং ফাকি দিয়ে সকাল ৭ টায় ঈদগাহ মাঠে বসে বসে এফ মেজর কর্ডটা যেদিন ধরতে শিখসিলাম ঐদিন মনে হ‌ইসিলো হিমালয় জয় করে ফেলসি। ঐদিন যে খুশি হ‌ইসিলাম ঐরকম খুশী আজকে ৫০,০০০ টাকার চাকরি পাইলেও হব না।

Read Also :

Post a Comment